দেশমাতৃকা ও কাজী নজরুল নিয়ে আজকের আলোচনা। আমাদের দেশে প্রতিভাকে বলা হয়েছে নব-নব উন্মেষশালিনী বুদ্ধি’। যেখানে নজরুল নিজের পরিবেশ বিস্তৃত হয়ে এবং আত্মাসমাহিত হয়ে কাব্যসাধনা করেছেন, সেখানে তাঁর এই প্রতিভার পরিচয় সুস্পষ্ট। দৃষ্টান্ত-স্বরূপ আমরা তাঁর ‘সিন্ধু’ কবিতাটির উল্লেখ করতে পারি। বিহারীলাল, রবীন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথ সকলেই সিন্ধু সম্পর্কে কবিতা রচনা করেছেন, কিন্তু নজরুলের ‘সিন্ধু’ কবিতাটি পূর্বগামী কবিদের প্রভাব থেকে প্রায় মুক্ত।

দেশমাতৃকা ও কাজী নজরুল
নজরুলের কবি-মানসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের প্রভাবও ও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চিত্তরঞ্জনের প্রবল ব্যক্তিত্ব, অজেয়, পৌরুষ, অনলস কর্মসাধনা, তীব্র স্বদেশ-প্রেম, ও অতুলন আত্মত্যাগ নজরুলের অন্তরে জাগিয়েছে সীমাহীন শ্রদ্ধা। দেশবন্ধুর মহাপ্রয়ানের পর ‘ইন্দ্রপতন’ কবিতায় কবি লিখেছেন,
লক্ষ্মী দানিল সোনার পাপড়ি, বীণা দিল কারে বাণী,
শিব মাখালেন ত্যাগের বিস্তৃতি কন্ঠে গরল দানি
বিষ্ণু দিলেন ভাঙনের গদা, যশোদা-দুলাল বাঁশি,
দিলেন অমিত তেজ ভাস্কর, মৃগাঙ্ক দিল হাসি।
চীর গৈরিক দিয়া আশিসিল ভারত-জননী বাদি
প্রতাপ শিবাজী দানিল মন্ত্ৰ দিল উষ্ণী বাঁধি।
বুদ্ধ দিলেন ভিক্ষাভাণ্ড, নিমাই দিলেন ঝুলি,
দেবতারা দিল মান্দরমালা, মানব মাখালো ধুলি।

নজরুলের যে সকল কবিতা ও গান বাঙলার তরুণদের মনে দেশমাতৃকার বন্ধন- মোচন ও শোষণমুক্ত সমাজে প্রতিষ্ঠার উন্মাদনা জাগিয়ে তুলেছে, সেগুলির উৎস হচ্ছে, স্বদেশপ্রেম ও লাঞ্ছিত মানবতার প্রতি সহানুভূতি। বঙ্কিমচন্দ্র জাতিকে স্বদেশ- প্রেমের যে মন্ত্র দান করেছেন, সেই মন্ত্রে সিদ্ধ হয়ে বহু সাধক মৃন্ময়ী দেশমাতৃকার মধ্যে চিন্ময়ী জগজ্জননীকে প্রত্যক্ষ করেছেন। মন্ত্রচৈতন্যের ফলে কবি নজরুলও দেশমাতৃকার মধ্যে চৈতন্যময়ীকে উপলব্ধি করলেন, তারপর, শৈব সাধক যেমন সংকীর্ণ স্বদেশগ্রেকে ‘উদার’ বিশ্বপ্রেমের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে বলেছিলেন,
মাতা মে পার্বতী দেবী পিতা দেবো মহেশ্বর:
বান্ধবা শিবভক্তাশ্চ স্বদেশো ভুবনত্রয়ম৷৷
কবি নজরুলও তেমনি দেশমাতৃকার আরাধনাকে বিশ্বজননীর উপাসনার ভেতর ডুবিয়ে দিয়ে যেন সিদ্ধপুরুষ রামপ্রসাদের মতো গেয়ে উঠলেন, মায়ের উদর ব্রহ্মাণ্ড-ভাণ্ড প্রকাণ্ড তা জান কেমন।

এই ব্রহ্মাত্মভাণ্ডোলরী জননীই আবার কবির দেহভাগুবিলাসিনী। সংস্কৃতে ‘মাতৃকা’ শব্দের অর্থ ‘ছোট মা’ আর এই শব্দ থেকেই বাংলায় ‘মাইয়া’ ও ‘মেয়ে’ শব্দের উদ্ভব হয়েছে। ‘দেবীস্তুতি’-রচয়িতা নজরুল বিশ্ব-মাতার (বড়ো মার) আরাধনার ভেতর দেশমাতৃকার (ছোট মায়ের) সেবার্চনাকে ডুবিয়ে দিয়েছেন।
‘দেবীস্তুতি’তে নজরুল মার্কণ্ডেয় পুরানের অন্তর্গত দেবসন্তবতীর ওপর নতুন আলোকপাত করেছেন। তিনি মধু-কৈটভ, মহিষাসুর, শুরু নিতন্ত্র প্রভৃতির রূপক ব্যাখ্যা করেছেন, মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহা-সরস্বতীর প্রচলিত ব্যাখ্যাও তিনি গ্রহণ করেন নি। (ভারতীয় তান্ত্রিক সাধকের দৃষ্টিতে মহাসরস্বতী, মহাকালী ও মহালক্ষ্মী হচ্ছেন যথাক্রমে জগন্মাতার জ্ঞানশক্তি, ইচ্ছাশক্তি ও ক্রিয়াশক্তি। অবশ্য, শ্রী শ্রী চণ্ডীর বিশদ আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা প্রদত্ত হয়েছে ‘সাধন-সমর’ নামক গ্রন্থমালায়। তথাপি “দেবীস্তুতি’ নামক গ্রন্থে সাধক নজরুলের একটি বিশিষ্ট্য পরিচয় রয়েছে ।
সাধক নজরুলের দেবীস্তুতি’ থেকে আমরা একটি অংশ উদ্ধৃত করছি, যিনি আদ্যাশক্তি, তিনিই পরমাত্মা। অগ্নি এবং তাহার দাহিকাশক্তি যেমন অভিন্ন, জল ও তাহার শীতলতা যেমন অভিন্ন, পরমাত্মা ও আদ্যাশক্তিও তেমনি অভিন্ন। আদি-অন্ত- হীন কালের বক্ষে লীলা করেন বলিয়া তিনি কালী। বিশ্বের সকল কিছুকে আকর্ষণ করেন বলিয়া কৃষ্ণ। তিনিই শিব, তিনিই রাম, তিনিই রাধা। বিশ্বের সকল জড়-জীব বিভিন্ন নামে তাহাকেই উপাসনা করে। তাই নজরুল দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য পরাধীনতার বিরুদ্ধে মুক্তির সংগ্রাম গড়ে তোলেন।

