নজরুলের গ্রামের মক্তবে শিক্ষকতা ও মসজিদে ইমামতি

শৈশব থেকেই কাজী নজরুল ইসলাম দারিদ্র্য ও সংগ্রামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামের সাধারণ ও অনুন্নত পরিবেশে জন্ম নেওয়া নজরুলের শৈশবজীবন ছিল প্রয়োজন, শ্রম ও সীমাবদ্ধতার কঠোর বাস্তবতায় আবদ্ধ। ১৯০৮ সালে পিতার মৃত্যুর পর পরিবারে আর্থিক সংকট ভয়াবহ হয়ে ওঠে। মাত্র নয়–দশ বছর বয়সেই তাঁকে সংসারের হাল ধরতে হয়, ফলে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন বড় বাধার সম্মুখীন হয়। কিন্তু এই কঠিন সময়ই নজরুলকে গড়ে তোলে—তাঁর ব্যতিক্রমী মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় চেতনা, সাহস ও সৃজনশীলতার বীজ রোপিত হয় এই সময়েই।

 

নজরুলের গ্রামের মক্তবে শিক্ষকতা ও মসজিদে ইমামতি

 

নজরুলের গ্রামের মক্তবে শিক্ষকতা ও মসজিদে ইমামতি

নজরুল গ্রামের স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই কাজের মাধ্যমে তিনি ছোটবেলাতেই নিয়মিতভাবে আজান দেওয়া, নামাজের আচার–অনুষ্ঠান পালন, ধর্মীয় পরিবেশে অবস্থান এবং ইসলামি আচরণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। পাশাপাশি তিনি গ্রামের মক্তব–এ পাঠ গ্রহণ করেন, যেখানে তিনি কুরআন, আরবি ব্যাকরণ, ইসলাম ধর্মতত্ত্ব, দর্শন এবং ইতিহাস অধ্যয়ন করেন। ১৯০৯ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন—যা দারিদ্র্যসঙ্কুল জীবনের মাঝে তাঁর মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় বহন করে।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

পরিবারের দায়িত্ব স্বল্প বয়সেই কাঁধে এসে পড়ায় নজরুল একই মক্তবে শিক্ষকতা শুরু করেন। মাত্র দশ বছর বয়সে শিক্ষকতা—এটি নজরুলের জীবনের অসাধারণ একটি অধ্যায়। শিক্ষাজীবন বন্ধ হয়ে গেলেও জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর প্রবল তৃষ্ণা কখনো কমেনি। শিক্ষকতা ছাড়াও তিনি আশপাশের গ্রামে মোল্লাগিরি, হাজি পালোয়ানের কবরের সেবক হিসেবে কাজ এবং মসজিদে ইমামতি করতেন। এতে তাঁর জীবিকা যেমন চলত, তেমনি তিনি ধর্মীয় আচার–ব্যবহারের গভীর তাত্ত্বিক ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতেন।

এইসব অভিজ্ঞতা নজরুলের অন্তরজগতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা—সাম্য, মানবতা, ভ্রাতৃত্ব, দয়া ও ন্যায়বিচার—তাঁর চিন্তাকে শাণিত করে এবং পরবর্তী সাহিত্য–সঙ্গীতে সে চেতনা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। নজরুল যে বাংলা সাহিত্যে ইসলামী ভাবধারা, হামদ–নাত, গজল, কাসিদা এবং সুফিবাদের উপাদান প্রবেশ করিয়েছিলেন—তার ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে ওঠে এই শৈশব–কৈশোরের মসজিদ–মক্তবজীবনের মধ্যেই। তিনি আরবি–ফারসি সাহিত্য, কুরআনের ভাষা ও দর্শনের সঙ্গে প্রথম পরিচয় পান এখানেই, যা পরবর্তী সময়ে তাঁকে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি কাব্য–স্রষ্টায় পরিণত করে।

এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক, নজরুল ধর্মকে কখনোই সংকীর্ণ আচারে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং তাঁর ধর্মচেতনা ছিল মানবতাকেন্দ্রিক—যা প্রমাণিত হয় তাঁর অসাম্প্রদায়িক কবিতা, গজল ও প্রবন্ধে। মসজিদের ভিতর থেকে অর্জিত ধর্মশিক্ষা যেমন তাঁকে ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলে, তেমনি জ্ঞানতৃষ্ণা তাঁকে নিয়ে যায় হিন্দু পুরাণ, বেদ–উপনিষদ, শাক্ত–বৈষ্ণব মতবাদ ও বিশ্বসাহিত্যের দিকে। তাই বলা হয়, তাঁর ধর্ম–দর্শন ছিল সমন্বয়ের দর্শন, আর তা শুরু হয়েছিল এই সরল, দরিদ্রমাখা, কিন্তু গভীর অর্থবহ মসজিদ–মক্তবজীবনের পথ ধরে।

সব মিলিয়ে, গ্রামের মক্তবে নজরুলের শিক্ষকতা এবং মসজিদে মুয়াজ্জিন–ইমামতি—এগুলো শুধু জীবিকার পথ ছিল না; বরং তাঁর সাহিত্যিক ও মানবিক বিকাশের শিকড়। এখান থেকেই জন্ম নেয় তাঁর ধর্মীয় অনুভূতির গভীরতা, সাধারণ মানুষের প্রতি মমতা, আর পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে ইসলামী চেতনার স্বতন্ত্র, আলোকোজ্জ্বল ধারার বিস্তার।

Leave a Comment