নজরুলের গানে উপমা ও অনুপ্রাসের অবস্থান

বাংলা গানের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান এক অসামান্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত নজরুলগীতি বাংলা সঙ্গীতের ধারা, ভাব, ভাষা ও সুরবৈচিত্র্যে এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। মাত্র কয়েক দশকের কর্মজীবনেও তিনি তিন হাজারেরও বেশি গান রচনা করেন, যার বিশাল অংশই তাঁর নিজের সুরে বাঁধা। বিষয়বৈচিত্র্যে নজরুলগীতি বাংলা গানকে দশটি স্বতন্ত্র ধারায় বিভক্ত করেছে—ভক্তিমূলক গান, প্রণয়গীতি, প্রকৃতি বন্দনা, দেশাত্মবোধক গান, রাগপ্রধান গান, হাসির গান, ব্যঙ্গাত্মক গান, রণসঙ্গীত, সমবেত সঙ্গীত এবং বিদেশী সুরাশ্রিত গান। এই বিশাল সৃজনভাণ্ডার শুধু বাংলা গানের ইতিহাসেই নয়, বাংলা ভাষার কাব্য–রূপেও সৃষ্টি করেছে নতুন নান্দনিক পরিসর। নজরুলের গানে ভাষা কখনো ছন্দময়, কখনো ঝংকারমণ্ডিত, কখনো রক্ত–মাংসের আবেগে ভরপুর—আর এই বৈশিষ্ট্যের অন্যতম কারণ তাঁর দক্ষ উপমা ও অনুপ্রাস প্রয়োগ

 

নজরুলের গানে উপমা ও অনুপ্রাসের অবস্থান

 

নজরুলের গানে উপমা ও অনুপ্রাসের অবস্থান । নজরুলের ভাবনা

 

নজরুল ভাষার অলংকারকে কেবল শব্দ–সজ্জা হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং তা কাব্যের আবেগ, বেদনা, প্রেম কিংবা উচ্ছ্বাসকে আরও জীবন্ত ও সুরেলা করে তুলেছে। তাঁর উপমা কল্পনাকে করে তোলে আরও স্পষ্ট ও রূপময়, আর অনুপ্রাস শব্দে সৃষ্টি করে ধ্বনির অন্তর্নিহিত সুর—যেন গানের শব্দগুলো নিজেই গেয়ে ওঠে সুরের ভেতর। বিশেষত নজরুলের প্রেম ও প্রকৃতিনির্ভর গানগুলোতে উপমার সুকোমল প্রয়োগ এবং রণসঙ্গীতে অনুপ্রাসের দ্রুত ধ্বনি–পুনরাবৃত্তি গানের আবেগকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। ফলে তাঁর গান শুধু সুরে নয়, ভাষাতেও হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

উদাহরণস্বরূপ, “প্রদীপ-শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম তোমারে সুন্দর বন্দিতে”—এই পঙক্তিতে নজরুল অত্যন্ত সুচারুভাবে পূর্ণ উপমা প্রয়োগ করেছেন। এখানে প্রাণ হলো উপমেয়, প্রদীপ–শিখা উপমান, সম তুলনা–সূচক শব্দ, আর সাধারণ ধর্ম হলো কাঁপন বা কম্পন। এই চারটি অঙ্গই উপস্থিত থাকায় এটি পূর্ণোপমার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রদীপশিখার কম্পনকে প্রাণের কম্পনের সঙ্গে তুলনা করে তিনি প্রেমের অস্থিরতা, আকাঙ্ক্ষা ও উদ্বেলতার এক অত্যন্ত দৃশ্যমান চিত্র নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি এখানে অনুপ্রাসের শক্তিও লক্ষণীয়—ন্দঙ্গ ব্যঞ্জনগুচ্ছের পুনরাবৃত্তিতে সৃষ্টি হয়েছে ছেকানুপ্রাস, আর শ/স, , ধ্বনির বহুমাত্রিক পুনরাবৃত্তি বাণীর সুরেলাতা বাড়িয়ে তুলেছে। এই ধ্বনির গুঞ্জন যেন হৃদস্পন্দনের স্পর্শ এনে দেয়, যা সঙ্গীতের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

আরেকটি উদাহরণ—“ওরে আমার বুকের বেদনা! ঝঞ্ঝা-কাতর নিশীথ রাতের কপোত সমরে আকুল এমন কাঁদন কেঁদনা”—এখানেও নজরুলের উপমা ও অনুপ্রাস দুটোর সুষম প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। এখানে উপমেয় বুকের বেদনা, উপমান ঝঞ্ঝা–কাতর নিশীথ রাতের কপোত, তুলনাবাচক শব্দ সম, এবং সাধারণ ধর্ম আকুল ক্রন্দন—ফলে এটি পূর্ণোপমা। উপমান হিসেবে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাতে পথহারানো কপোতের দৃশ্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর; এটি বেদনার অসহায়তা ও বিচ্ছিন্নতাকে গভীর করে তুলে ধরে। পাশাপাশি অনুপ্রাসের ধ্বনি–শৈলী— সাতবার, ছয়বার, পাঁচবার, এবং ম–ত তিনবার—গানটির আবেগময় রূপকে এক সুরেলা তীব্রতা দিয়েছে, যেন আকুল কপোতের বুকফাটা হাহাকার ধ্বনিত হচ্ছে শব্দের ভেতর।

সব মিলিয়ে, নজরুলের গানে উপমা ও অনুপ্রাস কেবল অলংকার নয়—তা তাঁর সৃষ্টির আত্মা। উপমা তাঁর কল্পনার রঙকে বাস্তব করে তুলেছে, আর অনুপ্রাস শব্দকে সুরে রূপান্তরিত করেছে। ভাষার এই কাব্যময় নির্মাণ তাঁর গানের ভাব–গভীরতাকে অর্থ ও আবেগে সমৃদ্ধ করেছে। ফলে নজরুলগীতি হয়ে উঠেছে শুধু সঙ্গীতরূপ নয়, বরং বাংলা ভাষার অলংকার–নন্দন, ছন্দ, ধ্বনি ও কল্পনার এক চিরকালীন জীবন্ত ভাণ্ডার।

Leave a Comment