কাজী নজরুলের গানে অপ্রচলিত রাগের ব্যবহার । নজরুলের ভাবনা

কাজী নজরুলের গানে অপ্রচলিত রাগের ব্যবহারঃ নজরুরের রাগপ্রধান গান রচনার ক্ষেত্রে অপ্রচলিত বা লুপ্ত রাগের ব্যবহার তার গানের একটি ঐতিহ্যগত রূপ। অপ্রচলিত রাগের ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি তাঁর রাগপ্রধান গানের বৈচিত্র্যতা শাস্ত্রীয় তথা রাগভিত্তিক গানের দক্ষতা সৃষ্টি করেছেন । আমরা তাঁর গানে অপ্রচলিত রাগের প্রচলন প্রক্রিয়ার ধারা বর্ণনায় করব।

 

কাজী নজরুলের গানে অপ্রচলিত রাগের ব্যবহার

 

কাজী নজরুলের গানে অপ্রচলিত রাগের ব্যবহার । নজরুলের ভাবনা

মন্তব্য :

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে গবেষণার প্রাক্কালে এবং তার প্রতিফলন বিভাজনের সময় অপ্রচলিত রাগ ব্যবহৃত গানের উনুেষ সম্পর্কে বিভিন্ন সঙ্গীত গুণীরা উচ্চ মতামত প্রদর্শন করেন। যেমন : প্রভাত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এর “ভাতরীয় রাগসঙ্গীত ও বাংলা গান” গ্রন্থে প্রফেসর জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী নজরুলের রাগপ্রধান গান তথা লুপ্ত রাগ প্রসঙ্গে যে মন্তব্য করেছেন তা হলো :

“দক্ষিণ ভারতীয় রাগ এবং উত্তরভারতীয় কিছু লুপ্ত রাগের সমন্বয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ফ্রেমে নজরুলসঙ্গীতকে প্রাণবন্ত রূপ দিয়েছে”।

রচনার প্রেক্ষাপট :

১৯২৯ সাল থেকেই মূলত কাজী নজরুল রাগ সঙ্গীত নিয়ে গবেষণা শুরু করেনে। সঙ্গীত জীবনের অববাহিকায় বিভিন্ন সঙ্গীত গুণীদের কাছে তিনি তালিম নিয়েছিলেন। যেমন সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, প্রকৃতি গঙ্গোপাধ্যায়, ওস্তান মুঞ্জু সাহেব, ওস্তাদ কবির খা, মাস্তান গামা, জমির উদ্দীন খাঁ, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যয় প্রমুখ। যার ফলশ্রুতিতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি বিশাল ভক্তি নজরুলের মধ্যে বিরাজমান ছিল। যার বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে নজরুলের রাগপ্রধান গান, ধ্রুপদ, ধামার ঠুমরী, টপ্পা অপ্রচলিত ও গুপ্ত পর্যায়ের গান রচনার মাধ্যমে।

 

কাজী নজরুলের গানে অপ্রচলিত রাগের ব্যবহার

 

নজরুলের অপ্রচলিত রাগে সঙ্গীত রচনার সময়কাল :

বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এটাই প্রমাণিত যে, নজরুল ১৯৩০ সাল থেকেই রাগের বিভিন্ন ক্ষেত্র নির্ণয়, গবেষনা এবং লুপ্ত রাগের ব্যবহারে সঙ্গীত রচনায় মননিবেশ করেন।

অপ্রচলিত রাগসমূহ :

পটমঞ্জুরী, আশা টোড়ী, দেবগান্ধারে, লাচ্ছাশাখ, লঙ্কাদাহন শারং, হিজাজ ভৈরবী, বড়হংস সারং ইত্যাদি।

দক্ষিণী রাগের ব্যবহারঃ

নজরুল কিছু গানে দক্ষিণী রাগ ব্যবহার করেন। কর্ণাটকী সমাপ্ত, দক্ষিনী প্রভৃতি ।

যেমনঃ কাবেরী নদী জলে কেগো
রাগ- কর্ণাটকী সামন্ত
তাল- ত্রিতাল।
গ্রন্থ: বুলবুল দ্বিতীয় খণ্ড
স্বররিপি: নজরুল সুর সঞ্চয়ন প্রথম খণ্ড
গীতি আলেখ্য: কাবেরী তীরে
প্রকাশকাল: ১৯৪১
রেকর্ড নং- ৮৭৬
শিল্পী: সুপ্রেভা ঘোষ

 

কাজী নজরুলের গানে অপ্রচলিত রাগের ব্যবহার

 

হারামনি:

১৯৩০ সালের দিকে সুরেশ চক্রোবর্তী কলকাতা বেতার থেকে নজরুলসঙ্গীত নিয়ে হারামনি নামে একটি অনুষ্ঠান প্রচার করতেন, সেখানে নজরুলের অপ্রচলিত রাগের প্রয়োগ ব্যাখ্যা ও গান প্রচারিত হতো। ক্রমান্বয়ে অনুষ্ঠানটি নান্দনিকভাবে পরিপূর্ণতা পায় যা নজরুলকে সমাদ্রিত করেছিল জনমানসে।

বিংশ শতাব্দীর ত্রিশদশকে নজরুল:

১৯২৯ সাল পরবর্তী সময়টা নজরুলের জীবনের একটি সাঙ্গীতিক উত্থান । একদিকে সঙ্গীত রচনা, সুর সংযোগ, রাগ নির্বাচন, অপ্রচলিত রাগের প্রচলন সবকিছু মিলে বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ দশক নজরুলের জন্য স্বর্ণালী সময়।

তালের ব্যবহার :

ত্রিতাল, আদ্ধা ও ঝাঁপতালের প্রয়োগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়।

বাণীর ধারাবাহিকতা:

রাগপ্রধান গান যেহেতু রাগাশ্রীয় কাব্যগীতি সেইমর্মে রাগের প্রয়োগ অপ্রচলিত হলেও এই পর্যায়ের গানের বাণীর ধারাবাহিকতা নজরুলের কাব্যগীতির সামিল।

গীতিশৈলী:

প্রথমে সামান্য আলাপ লক্ষ্যণীয়, পরবর্তীতে স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ দেখা যায় তবে অপ্রচলিত রাগের গানে তান করবার প্রয়োজন নেই। প্রকৃতপক্ষে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পানৱণী শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব এই গান নান্দনিকভাবে সম্পন্ন করা।

 

google news logo

 

অবয়ব :

অবয়ব হিসাবে স্থায়ী প্রথমে পরবর্তীতে লঘুসঙ্গীতের মতোই অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ গাওয়া হয় ।

উপসংহার :

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে দেখা যায় যে, কাজী নজরুল ইসলাম শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন, তা না হলে তিনি কখনো অপ্রচলিত রাগের ব্যবহার তাঁর গানে দেখানো সম্ভব হতো না। এখনো অপ্রচলিত রাগের গান সাধারণভাবে সমাদৃত নয় কারণ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পারদর্শিতা ছাড়া এ গান পরিবেশন করা সম্ভব নয়। আর শোনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তো থাকবেই। তবে একথা সত্য যে কাজী নজরুলের মতো অন্য কেউ এতটা নান্দনিকভাবে অপ্রচলিত রাগের ব্যবহার দেখাতে সক্ষম হননি যা নজরুল রচনাকে সার্থক রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে।

Leave a Comment