নজরুলের গজলগানের শেয়রের ব্যবহার : নজরুলের গজল গান তাঁর রচিত পর্যায়গুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। গজল শব্দটি আরবী। এর অর্থ হচ্ছে প্রনয়বিষয়ক কবিতা। নজরুল রচিত গজল গানগুলিকে উৎকৃষ্ট কাব্যগীতি বললে হয়তো ভুল হবে না। মানবিক প্রেমের এই গানগুলো ভাবময়, উপমামণ্ডিত এবং অলংকারযুক্ত।

নজরুলের গজলগানের শেয়রের ব্যবহার । নজরুলের ভাবনা
নজরুলের অধিকাংশ গজলেই একটি রোমান্টিক হৃদয়ের বিস্ময় বা সকরুণ বেদনার সুর ধ্বনিত। প্রেমে, বিরহে, যন্ত্রণায়, বিষাদে নজরুলের গজলের শব্দ, উপমা, পূর্বোল্লেখ স্তবকবিন্যাস প্রভৃতির একটি স্বকীয় পরিমণ্ডল আছে যা সহজেই চেনা যায় গজল গানে। আর এই পরিমণ্ডলে উর্দু ও ফারসী গজলের সৌরভের প্রাণটুকুও মেলে সহজে যেহেতু বাংলা গজলের এই মনোহর দ্বীপ, উর্দু ও ফারসী গজলের পলি দিয়ে নির্মিত।
বাংলা গজলকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে নজরুলের গজল। বাংলা গজলকে অলংকৃত করেছে নজরুলের শেয়রের স্থানটি। শেয়র অংশটি হয় সুরযুক্ত কিন্তু তাল ছাড়া। একে একধরনের সুরেলা আবৃত্তিও বলে । গজল গানে শেয়র যুক্ত রয়েছে সে-সকল গানের রয়েছে কাব্যশ্রীমণ্ডিত পদের নিহিত গভীরভাব বা বাহ্যিক রূপ প্রকাশ করবার ক্ষমতা।

মূলত নজরুল গানের ভাবকে সঠিক রাখবার প্রয়োজনে মাঝে মাঝে তালকে পরিহার করে শেয়র সংযুক্ত করেছেন। এতে একদিকে গায়ক যেমন গানের সেই বিশেষ অংশের রসমাধুর্য্য প্রকাশের স্ফূর্ত পান তেমনি অপরদিকে শ্রোতার মনও আকৃষ্ট হয়। এ প্রসঙ্গে সঙ্গীতশাস্ত্রী রাজ্যেশ্বর মিত্রের মতে “নজরুল বাংলা গজল গানে একটি নতুনত্ব এনেছেন সেটি হলো শেয়র বা সুরসহযোগে কাব্যপাঠ”।
এই সুরের ভঙ্গির সঙ্গে আমাদের কথকতার ভঙ্গির অনেক তফাৎ, কেননা এটা হচ্ছে কাব্যবদ্ধেরই একটা অঙ্গ। গানের মতোই সুরে সঞ্চরণ এবং প্রকৃতি খানিকটা আলাপে ঘেঁষা। এক শুখভঙ্গিতে সুর করে আবৃত্তি করবার পর তাদের প্রয়োগ ও ছন্দের ঝোঁক একটি অপরূপ বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করে, উদাহরণ হিসেবে নজরুলের বিখ্যাত গানের উল্লেখ করা যায়। “দাঁড়ালে দুয়ারে মোর কে তুমি ভিখারিণী”।
গজল ছাড়াও এই বিশেষ টেকনিক নজরুল অনেক গানেই ব্যবহার করেছেন বটে। সার্বিক সাঙ্গীতিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, নজরুল পূর্ব গজল গানের সাঙ্গীতিক অবকাঠামোর চাইতে নজরুলের গজল অনেক পরিপূর্ণ, যার প্রমাণ তার একাধিক গজল গানে পুনঃপুনঃ সাক্ষর রেখেছেন। শেয়রের সংযুক্তির ফলে নজরুলের গজল বাংলা গানকে করেছে সমৃদ্ধ ও গীতিময়।


