ক্রিটিক্যাল হিউম্যানিস্ট নজরুল

মানবতার ইতিহাসে রেনেসাঁস বা নবজাগরণ ছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা। ইউরোপের এই নবজাগরণের যুগে মানুষ প্রথমবারের মতো ধর্মের অনুশাসনের গণ্ডি পেরিয়ে স্বাধীন বুদ্ধি, যুক্তি ও মানবমর্যাদার মূল্যবোধে বিশ্বাস স্থাপন করতে শেখে। রেনেসাঁস শুধু কান্তিলিয়ন (১৪৭৮–১৫২৯)-এর মতো ‘জেন্টলম্যান’দেরই জন্ম দেয়নি, বরং লরেঞ্জো ভ্যালা, এরাসমাস, মিশেল দ্য মনতেন প্রমুখ সমালোচনাশীল মানবতাবাদী বা ক্রিটিক্যাল হিউম্যানিস্টদেরও জন্ম দিয়েছিল। তারা মধ্যযুগীয় জড়ত্ব, ধর্মীয় অন্ধতা ও অমানবিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক আঘাত হেনেছিলেন।

 

ক্রিটিক্যাল হিউম্যানিস্ট

 

ক্রিটিক্যাল হিউম্যানিস্ট নজরুল

বাংলার পরিসরে সেই রেনেসাঁসের প্রতিফলন দেখা যায় উনিশ শতকের প্রথমার্ধে। রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২–১৮৩৩) প্রাচীন ধর্মীয় জড়তার বিরুদ্ধে যুক্তির আলো জ্বালিয়ে দেন; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০–১৮৯১) নারীশিক্ষা, বিধবা-বিবাহ ও সমাজসংস্কারের অগ্রদূত হয়ে ওঠেন; আর ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন যুক্তিবাদী প্রতিবাদের এক তরঙ্গ সৃষ্টি করে। তারা সবাই এক প্রকারে ছিলেন “বাঙালি রেনেসাঁসের ক্রিটিক্যাল হিউম্যানিস্ট”—যাঁরা মানুষকে চিনতে, বুঝতে ও মুক্ত করতে চেয়েছিলেন।

এই ঐতিহ্যের পরবর্তী বিকাশ দেখা যায় বিংশ শতাব্দীতে কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে।
নজরুল ছিলেন এমন এক মননশীল ও বিপ্লবী কবি, যিনি সাহিত্য, সংগীত ও চিন্তাধারার মাধ্যমে মানুষের মুক্তি, সমতা ও ন্যায়ের পক্ষে কলম ধরেছিলেন। তিনি ছিলেন ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও শ্রেণির সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন কবিতা ও গানের নান্দনিকতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে তীক্ষ্ণ সামাজিক সমালোচনা ও মুক্ত মানবতার দর্শন।

ক্রিটিক্যাল হিউম্যানিস্ট

 

হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দৃষ্টিকোণ ও নজরুলের যুক্তিবাদ

নজরুলের সময়ের ভারত ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীন, যখন সমাজে ধর্মীয় বিভাজন, সম্প্রদায়িক হিংসা ও রাজনৈতিক কৌশলে ‘বিভাজন ও শাসন’-এর নীতি চরমে পৌঁছেছিল। এই সময় নজরুল ছিলেন এক অপ্রতিরোধ্য ক্রিটিক্যাল হিউম্যানিস্ট, যিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় সমাজের গোঁড়ামিকে সমানভাবে আঘাত করেছেন।

তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘হিন্দু-মুসলমান’ (রুদ্রমঙ্গল, ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) এ তিনি লিখেছিলেন —

“হিন্দুত্ব মুসলমানত্ব দুই সওয়া যায় কিন্তু তাদের টিকিত্ব দাড়িত্ব অসহ্য, কেননা দুটোই মারামারি বাধায়। টিকিত্ব হিন্দুত্ব নয়, ওটা হয়তো পণ্ডিত্ব। তেমনি দাড়ি ইসলামত্ব নয়, ওটা মোল্লাত্ব। এই দুই ‘ত্ব’ মার্কা চুলের গোছা নিয়ে এত চুলোচুলি!”

এই উক্তিটি শুধু ব্যঙ্গাত্মক নয়, বরং গভীর দার্শনিক তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, ধর্মের অন্তর্নিহিত মানবিক মূল্যবোধকে ভুলে গিয়ে বাহ্যিক আচরণ ও গোঁড়ামিতে মানুষ হারিয়ে ফেলছে তার মানবিকতা। নজরুলের কাছে মানুষের ধর্ম মানেই মানবতা, এবং ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে নৈতিক চেতনা ও ভালোবাসা ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নজরুলের কলম: প্রতিবাদের আগুন

নজরুল ছিলেন এক অদম্য বিপ্লবী চেতনার কবি। তাঁর কবিতা ও গানে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন জ্বলেছে।
তাঁর কলম যেন এক প্রকার অসির রূপ নিয়েছিল—যা মিথ্যা, ভণ্ডামি ও শোষণের পর্দা ছিন্ন করে সত্য প্রকাশ করত।

তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ এই ধারারই এক তীব্র উদাহরণ, যেখানে তিনি জাতপাত ও সামাজিক বিভেদের বিরুদ্ধে তীব্র ব্যঙ্গ ছুড়েছেন। কবি প্রশ্ন করেছেন—

“জাতের নামে বজ্জাতি সব, জাত গেল তাতেই জাত গেল রে!”

এই কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে গর্জে ওঠে নজরুলের সেই মানবতাবাদী কণ্ঠ, যা সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাকে ভেদ করে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়।

উপনিবেশবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি

নজরুল শুধু ধর্মীয় বা সামাজিক বিদ্রোহী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক রাজনৈতিক ক্রিটিক্যাল হিউম্যানিস্ট। তাঁর কলমে প্রতিফলিত হয়েছে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও স্বাধীনতার জন্য আহ্বান।
“বিদ্রোহী”, “দারিদ্র্য”, “চল চল চল” প্রভৃতি কবিতা ও গান ব্রিটিশ শাসনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী কণ্ঠস্বর।

এই প্রতিবাদী চেতনার জন্যই নজরুলকে ব্রিটিশ সরকার ‘রাজদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তাঁর বহু রচনা বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং তাঁকে কারাবন্দি করা হয়। অন্যদিকে, সমাজের গোঁড়া মোল্লারা তাঁর প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে ‘ধর্মবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তাঁকে ‘শয়তান’ বলেও চিহ্নিত করে। কিন্তু নজরুল কখনোই আপস করেননি—তিনি নিজেই লিখেছিলেন,

“আমি শয়তান যদি বিদ্রোহ মানে শয়তানিত্ব হয়, তবে আমি শয়তান!”

এই সাহসিকতাই তাঁকে করে তুলেছে বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য মানবতাবাদী চিন্তকের প্রতীক।

মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ

নজরুলের মানবতাবাদ ধর্ম, জাতি ও রাষ্ট্রীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মৌলিক পরিচয় হলো মানুষ হওয়া
তাঁর ভাষায় —

“মানুষের উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।”

তিনি মুসলমান হয়েও হিন্দু দেবদেবী নিয়ে গান লিখেছেন, হিন্দু সমাজের অন্তর্গত থেকেও ইসলামের আধ্যাত্মিক দিককে প্রশংসা করেছেন। তাঁর মানবতাবাদ তাই ছিল সার্বজনীন ও সংহত, কোনো সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।

কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম শুধু এক “বিদ্রোহী কবি” নন; তিনি ছিলেন এক ক্রিটিক্যাল হিউম্যানিস্ট চিন্তাবিদ, যিনি ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি ও সাহিত্য—সব ক্ষেত্রেই মানুষের মুক্ত চিন্তা ও মর্যাদার স্বপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর চিন্তায় বিদ্রোহ মানে ধ্বংস নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা

নজরুলের মানবতাবাদ আজও সমান প্রাসঙ্গিক—যেখানে ধর্ম, বর্ণ ও মতের বিভাজনে মানবতা বিপন্ন, সেখানে নজরুলের আহ্বান প্রতিধ্বনিত হয়—

“ভালোবাসা শেখো মানুষকে, ধর্মের নাম নিলে নয়, কর্মে প্রমাণ দাও যে তুমি মানুষ।”

তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়—
মানুষের সর্বোচ্চ ধর্ম মানবতা, আর সত্যিকারের কবির কলম কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, ন্যায়ের জন্যও জ্বলে।

Leave a Comment