কাজী নজরুলের কাব্য ও গানে আরবি ও ফার্সি ব্যবহার

কাজী নজরুলের কাব্য ও গানে আরবি ও ফার্সি ব্যবহার নিয়ে আজকের আলোজনা। বাংলা সাহিত্যের আরবি ও ফার্সি শব্দ ব্যবহারের একটি ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। প্রসঙ্গত সেটা স্মরণ করা জরুরি। এদেশে ইংরেজ আগমনের পূর্বে রাজভাষা ছিল ফার্সি।

বিদেশ গত রাজন্য, নৃপতি, অমাত্যবর্গ রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার করতেন ফার্সি, শাসকগোষ্ঠীর কৃপা-আনুকূল্য ও চাকুরি-বাকরি লাভের আশায় উপমহাদেশর মানুষ তখন রাজভাষা আরবি-ফার্সি শিখতেন। ব্যুৎপত্তি ও পাণ্ডিত্য অর্জনের চেষ্টা করতেন এ দুভাষায়। সঙ্গত কারণেই সাহিত্যে-এর সুদূর প্রসারী প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। মুসলিম কবিদের সৃষ্ট মধ্যযুগের রোমান্টিক প্রণয়োপখ্যানগুলো এর প্রকৃষ্ট নজির।

 

কাজী নজরুলের কাব্য ও গানে আরবি ও ফার্সি ব্যবহার

 

কাজী নজরুলের কাব্য ও গানে আরবি ও ফার্সি ব্যবহার

নজরুলের হাতে আরবি ও ফার্সি শব্দের পরিচ্ছন্ন ব্যবহারের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। এ পর্যায়ে সম্ভবত কাব্য রসিক বোদ্ধা পাঠকেরা অস্বীকার করবে না যে নজরুল এ বিষয়ে যথেষ্ট মুনসিয়ানার পরিচয় দিতে পেরেছেন। পেরেছেন ভাবের পালে নতুন হাওয়া জোগাতে। বিশিষ্ট দু’জন ফার্সি কবির রুবাইয়াৎ অনুবাদ করতে গিয়েও নজরুল স্বীয় প্রতিভার স্বকীয়তা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছেন।

 

কাজী নজরুলের কাব্য ও গানে আরবি ও ফার্সি ব্যবহার

 

কবি দু’জন হচ্ছেন হাফিজ ও ওমর খৈয়াম। কাব্যদুটি হচ্ছে ‘রুবাইয়া’-ই হাফিজ’ ও ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম। রুবাইয়াৎ দুটির অনুবাদের অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে বাংলা কাব্যে ইরানি আবহের সঙ্গে আমাদের দেশীয় ভাব মাধুর্যের সম্মিলন। নজরুল যেহেতু আরবি ও ফার্সি-মুটি ভাষাতেই অনেকটা অভিজ্ঞ ছিলেন সেহেতু তাঁর পক্ষে মূল ব্যঞ্জনা ঠিক রেখে অনুবাদের কাব্য সৌকর্য ও মাধুর্য সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ফার্সিকাব্যের মূল ব্যঞ্জনা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়োজনেই অনুবাদে বহু ফার্সি শব্দ ব্যবহার করতে হয়েছে নজরুলকে এবং তাতে তিনি যে অভূতপূর্ব সাফল্য প্রদর্শন করেছেন বর্তমান প্রসঙ্গে সেটাই স্মরণযোগ্য।

 

কাজী নজরুলের কাব্য ও গানে আরবি ও ফার্সি ব্যবহার

 

নজরুলের কাব্য বা গানে আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘চন্দ্রবিন্দু’র (১৩০৭) ৪৩নং গানটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এ কারণে যে, গানের গঠন প্রণালী নির্মাণে নজরুল অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ‘কাবা’, ‘রসুল’, ‘খোদা’, ‘আরশ’, ‘মজনু’, ‘লা-ইলা’, ‘দরবেশ’, ইশক’, ‘মসজিদ’, ‘আজান’, ‘মুয়াজ্জিন’, “কোরান, রুহ’, ‘রোজকিয়ামত’, ‘পুলসিরাত’ প্রভৃতি মুসলিম পারিভাষিক আরবি- ফার্সি শব্দগুলোর প্রয়োগগত নৈপুন্য উপলব্ধি করার জন্য গানটির প্রাসঙ্গিক কিছু অংশ উদ্ধৃত করা জরুরি মনে করি,

বক্ষে আমার কা’বার ছবি,
চক্ষে মোহাম্মদ রসুল
শিরোপরি মোর খোদার আরশ,
গাই তারি গান পথ বেভুল ।

 

google news logo

 

নজরুলের হাতে না’তে রসুলের সিদ্ধি সর্বজনস্বীকৃত। ইসলামি গান ও গজলেও নজরুলের সমকক্ষ কবি-প্রতিভা দুনিরিক্ষজন। এসব ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যের উৎস মূল অনুসন্ধান করলে আরবি-ফার্সি শব্দ প্রয়োগের কৃতিত্বই সর্বাগ্রে সনাক্ত হয়। আবার আধ্যাত্মমূলক গান রচনার ক্ষেত্রে তাঁর যে অশেষ সাফল্য, সেখানেও আরবি শব্দের সুপ্রযুক্তিই মূল চাবিকাঠি ।

Leave a Comment