কাজী নজরুলের গীতিআলেখ্য

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির যে বিস্তৃত পরিসর, সেখানে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এক দুর্দান্ত বহুমুখী প্রতিভা। কবিতা, গান, উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ—কোথাও তিনি তাঁর দাপুটে সৃজনশক্তির ছাপ রাখতে ভুল করেননি। বাংলা সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য, এবং এই অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর গীতিআলেখ্য রচনা। গীতিআলেখ্য হলো সংগীত, নাট্য, কবিতা ও কথকের সমন্বয়ে নির্মিত এক অভিনব শিল্পরূপ—যা বাংলায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় নজরুলের হাতে। এই ধারার মাধ্যমে তিনি শুধু সংগীতসাহিত্য নয়, বাংলা মঞ্চশিল্পের দিক থেকেও এক নয়া দিগন্ত উন্মোচন করেন।

 

কাজী নজরুলের গীতিআলেখ্য

 

কাজী নজরুলের গীতিআলেখ্য । নজরুলের ভাবনা

নজরুলের গীতিনাট্যর সূচনার পেছনে রয়েছে আসানসোল অঞ্চলের লেটো গান, যা ছিল কথকতা, যাত্রানাট্য ও হাফ-আখড়াইয়ের বৈশিষ্ট্য মিশ্রিত এক জনপ্রিয় লোকমঞ্চ শিল্প। এই লেটো গান ছিল অর্ধনাট্য–অর্ধসঙ্গীতধর্মী, যেখানে কাহিনি বলা, সংলাপ, গানের পালা—সব মিলিয়ে একটি অভিনব মঞ্চ উপস্থাপনা তৈরি হতো। কিশোর বয়সেই নজরুল এই লেটো দলে যুক্ত হয়ে পালা রচনায় হাত পাকান। তাঁর রচিত পালাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—মেঘনাদবধ, শকুনিবধ, ঠগপুরের সঙ, দাতাকর্ণ, রাজপুত্র, আকবর বাদশা, কবি কালিদাস ইত্যাদি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য “চাষার সঙ”—যা তিনি দেহতত্ত্বমূলক প্রতীকধর্মী নাটিকা হিসেবে রচনা করেন। চাষার সঙ জনমানসে এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে এটি প্রথম লেটো গানের ক্ষেত্র পেরিয়ে বৃহত্তর দর্শকমণ্ডলীতে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। তাঁর প্রতিটি রচনায় দেখা যায় লোকসংস্কৃতি, দেহতত্ত্ব, সামাজিক রূপক এবং ব্যঙ্গ–বিদ্রূপের অপূর্ব শিল্পসম্মত ব্যবহার।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

এই ধারাবাহিকতাতেই নজরুল রচনা করেন “আলেয়া” গীতিনাট্য। আলেয়ার ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন—
“এই ধূলির ধরায় প্রেম ভালোবাসা আলেয়ার আলো। সিক্ত হৃদয়ের জলাভূমিতে নজরুলের জন্ম। ভ্রান্ত পথিককে পথ হতে পথাস্তরে নিয়ে যাওয়াই এর ধর্ম।”
এই কথাগুলো তাঁর গীতিআলেখ্যের শিল্প-দর্শনকে সুস্পষ্ট করে—জীবন, মানবতা, ভালোবাসা, পথভ্রষ্টতা, আলো–অন্ধকারের দ্বন্দ্ব এবং মানুষের অন্তর্জগতের অন্বেষণ। নজরুল গীতিনাট্যকে কেবল বিনোদনরূপে দেখেননি; তিনি এটিকে মানুষের মন ও সমাজকে জাগিয়ে তোলার এক অভিনব মাধ্যম বানিয়েছিলেন।

১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে তিনি রচনা করেন মধুমালা, যা তাঁর গীতিআলেখ্য সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৪৫ সালে। মধুমালায় রূপকথা, প্রেম, প্রকৃতি এবং আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া মিলিয়ে এক সংগীত–নাট্যকাল্পনিক জগত নির্মিত হয়েছে। এই গীতিনাট্য নজরুলের কল্পনা–দক্ষতা, সুর–প্রতিভা এবং নাট্যরচনার শিল্পকে একইসঙ্গে ধারণ করে।

শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নয়—নজরুল শিশু-কিশোরদের জন্যও একাধিক গীতিআলেখ্য রচনা করেন। পুতুলের বিয়ে, অতনুর দেশে, বনের বেদে, গুলবাগিচা, শালপিয়ালের বনে—এসব রচনায় শিশুর জগত, কল্পনাশক্তি, প্রকৃতিসংলগ্নতা এবং আনন্দমাখা নির্দোষ ভাবনা বড়দের সাহিত্যেও নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। শিশুদের জন্য সৃষ্ট এসব গীতিআলেখ্য প্রমাণ করে নজরুলের সৃজনশীলতা কতটা বিস্তৃত এবং বহুমুখী ছিল।

নজরুলের উল্লেখযোগ্য গীতিআলেখ্যের মধ্যে আরও রয়েছে—
১. বিজয়া: ১৯৩১ সালের ২২ অক্টোবর আকাশবাণী থেকে প্রচারিত হয়। এটি ছিল নজরুলের আকাশবাণীর প্রথম দিকের প্রকাশিত গীতিআলেখ্যের একটি।
২. দেবীস্তুতি: কলকাতা আকাশবাণীতে ১৯৩৮ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রচারিত। দেবী আরাধনা, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং নাট্যমঞ্চের ভাবপ্রবাহের সমন্বয়ে নির্মিত।
৩. আকাশবাণী: কলকাতা কেন্দ্রের নামকরণ উপলক্ষে ১৯৪০ সালের ২০ আগস্ট পরিবেশিত হয়—বাংলা আকাশবাণীর ইতিহাসে নজরুলের অন্যতম মূল্যবান অবদান।
৪. শারদশ্রী: ১৯৪১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর আকাশবাণী কেন্দ্র থেকেই প্রচারিত। শরৎকালের আবহ, মাতৃআরাধনা ও রসনির্মাণের অনন্য কাব্য–সঙ্গীত উপস্থাপনা।

সব মিলিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের গীতিআলেখ্য বাংলা সংগীতনাট্যের ইতিহাসে এক নবতর অধ্যায়। তিনি লোকসংস্কৃতি, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, নাট্যরীতির অভিজ্ঞতা, সমাজচেতনা ও কাব্যরস—সবকিছুকে মিলিয়ে এমন এক শিল্পধারা সৃষ্টি করেছেন, যার তুলনা বাংলা সংস্কৃতিতে বিরল। নজরুলের গীতিআলেখ্য তাই কেবল সংগীতনাট্য নয়—এটি তাঁর চিন্তা, মানবতা, সৃজনশৈলী এবং শিল্পদর্শনের এক মহামূল্যবান নিদর্শন।

Leave a Comment