কবি নজরুলের যন্ত্রসঙ্গীত শেখা সম্পর্কে আলোচনা

কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গীত–জীবন বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে তিনি শুধু একজন কবি বা গীতিকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীতজ্ঞ। তাঁর সাঙ্গীতিক প্রতিভা ছিল বহুমুখী—বাণী, সুর, রাগ–রাগিণী, তাল–লয় থেকে শুরু করে যন্ত্রসঙ্গীতেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। তাঁর সৃষ্ট সঙ্গীতের বিস্তৃত পরিসর—হামদ–নাত, গজল, নজরুলগীতি, শ্যামাসঙ্গীত, কোরাস, দেশাত্মবোধক গান, রাগভিত্তিক ধ্রুপদী রচনা—সবকিছুর অন্তরালেই ছিল যন্ত্রসঙ্গীতে তাঁর গভীর জ্ঞান ও নিয়মিত চর্চা।

 

কবি নজরুলের যন্ত্রসঙ্গীত শেখা সম্পর্কে আলোচনা

 

কবি নজরুলের যন্ত্রসঙ্গীত শেখা সম্পর্কে আলোচনা

প্রথমদিকে নজরুলের যন্ত্রসঙ্গীত–শিক্ষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উৎস ছিল চাচা কাজী বজলে করিম, যিনি চুরুলিয়া অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত লেটো–উস্তাদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বজলে করিম আরবি, ফারসি, উর্দু, বাংলা—এই চার ভাষার সংমিশ্রণে যে ধরনের গান রচনা করতেন এবং সেগুলো লেটো দলের আয়োজনে পরিবেশিত হতো, সেগুলো নজরুলের কিশোর মনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বজলে করিমের সংস্পর্শেই নজরুল প্রথম বুঝতে পারেন সুর, লয়, যন্ত্রসঙ্গীত ও কণ্ঠ প্রকাশের বৈচিত্র্যময় রূপ। চুরুলিয়ার লেটো দলে যোগ দিয়েই নজরুল সঙ্গীত ও নাট্যশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন। এখানেই তাঁর সাহিত্যচর্চা ও সুর–সংগীত চর্চার প্রথম বীজ বপন হয়।

 

কবি নজরুলের যন্ত্রসঙ্গীত শেখা সম্পর্কে আলোচনা

 

লেটো দলের পরিবেশ ছিল এক অনন্য সৃজনশীল বিদ্যালয়। এখানে তিনি নিয়মিত অংশ নিতেন শেখ চকোর (গোদা কবি) এবং কবিয়া বাসুদেবের কবিগান ও লেটো–গানের আসরে। ঢোল, করতাল, দোতরা, বাঁশি, বেহালা—যে সমস্ত যন্ত্র লেটো দলে ব্যবহৃত হতো—সেগুলোর প্রতিটির সঙ্গে নজরুলের ছিল প্রত্যক্ষ পরিচয়। শিশুমনেই যে অদ্ভুত সঙ্গীতমেধা ছিল, তা এই লোকজ যন্ত্রসংগীতের চর্চায় আরও পরিপুষ্ট হয়। হয়তো সেই কারণেই পরের জীবনে তাঁর গানগুলিতে দেখা যায় লোক–ঐতিহ্য, ধ্রুপদী সুর, বিদেশি সুরাভাস ও রাগ–রাগিণীর দুর্লভ সমন্বয়।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

পরবর্তী জীবনে নজরুলের সংগীতশিক্ষা আরও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। তিনি যখন হুগলিতে অবস্থান করছিলেন, তখন সমকালীন বিখ্যাত সেতার–বাদক প্রকৃতি গঙ্গোপাধ্যায়–এর কাছে তিনি সেতার বাজানোর তালিম গ্রহণ করেন। সেতার শেখার মধ্য দিয়ে তিনি হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীত, বিশেষ করে রাগ–রাগিণীর গভীর গঠন, বোল, আঙ্গিক ও সুর–মেজাজ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেন। এই সেতার–জ্ঞান পরবর্তী সময়ে তাঁর রাগভিত্তিক নজরুলগীতিতে বিস্ময়করভাবে ফুটে ওঠে।

একই সঙ্গে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সময় তিনি ঘনিষ্ঠ হন হাবিলদার নিত্যানন্দ–এর সঙ্গে, যিনি তাঁকে প্রশিক্ষণ দেন অর্গান (হারমোনিয়াম)–এ। অর্গান শেখার ফলে নজরুল সুররচনা, সুরের লয়–নিয়ন্ত্রণ, স্বর–ব্যপ্তি, মেলোডি–গঠন এবং গানের কাঠামো নির্মাণে যাবতীয় দক্ষতা অর্জন করেন। অর্গান তাঁর সঙ্গীতজীবনের প্রধান সঙ্গী হয়ে ওঠে—অনেক গানের সুর তিনি হারমোনিয়ামে বসেই তৈরি করেছেন। হারমোনিয়ামের সুরলহরী তাঁকে শাস্ত্রীয় রাগচর্চা আরও সহজ করে দেয়, ফলে তিনি লুপ্তপ্রায় বহু রাগকে নতুন করে আবিষ্কার ও ব্যবহার করতে সক্ষম হন।

তাঁর যন্ত্রসঙ্গীত শেখার অভিজ্ঞতা কেবল তাঁকে একজন পারদর্শী সুরকার বানায়নি; বরং তিনি বাংলা সংগীতকে দিয়েছেন এক নতুন উচ্চতা। লেটো গানের লোকজ ছন্দ–সুর, শাস্ত্রীয় সেতারের গাম্ভীর্য, অর্গানের মেলোডিক কাঠামো—সব মিলিয়ে নজরুলের গান হয়ে ওঠে একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক, দেশীয় ও বিশ্বসংগীতধারার এক অভূতপূর্ব সমন্বয়।

বাংলাদেশে তাঁকে “জাতীয় কবি” হিসেবে মর্যাদা দেওয়া শুধু সাহিত্যিক কারণে নয়—সংগীতের জগতে তাঁর অবদানের জন্যও। বাংলা ভাষায় মুসলিম সংগীতধারা প্রতিষ্ঠা, গজল–চর্চার বিস্তার, রাগ–সৃষ্টিতে নবত্ব, শ্যামাসঙ্গীতে নতুন সুর–বিন্যাস—এসবই তাঁর যন্ত্রসঙ্গীত–অভিজ্ঞতার ফসল। এমনকি তাঁর বিদ্রোহী সত্তা, সাম্যবাদী চেতনা এবং সমাজবদলের আকাঙ্ক্ষাও সুরের ভেতর প্রকাশ পেয়েছে এক তীব্র শক্তিতে।

তাই বলা যায়—কাজী নজরুল ইসলামের যন্ত্রসঙ্গীত শিক্ষা তাঁর শিল্পীজীবনের মেরুদণ্ড। যন্ত্রসঙ্গীত তাঁকে দিয়েছে বোধ, শৃঙ্খলা, সৌন্দর্য উপলব্ধি, সুর ঠেকার ক্ষমতা এবং সৃষ্টিশীল স্বাধীনতা—যার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি রচনা করেছেন চার হাজারেরও বেশি গান এবং বাংলা সঙ্গীতকে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়, নতুন যুগে।

Leave a Comment