কবি নজরুলের মা ও কবি পত্নি প্রমিলার মৃত্যু

বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিজীবন ছিল যেমন সৃজনশীল দীপ্তিতে উজ্জ্বল, তেমনি ছিল দুঃখ–বেদনা, সংগ্রাম ও অবিরাম মানবিক পরীক্ষায় পূর্ণ। তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর আবেগময় দুটি অধ্যায় হলো—মাতা জাহেদা খাতুনের মৃত্যু এবং পত্নী প্রমীলা নজরুল ইসলামের দীর্ঘ রোগভোগ ও পরিণত প্রস্থান। এই দুই নারীর উপস্থিতি নজরুলের জীবনে ছিল মমতা, শক্তি, প্রেরণা এবং জীবনের বাস্তবতাকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করার পথ। তাই তাঁদের মৃত্যু নজরুলের জীবনে রেখে গেছে গভীর ক্ষত, নিঃশব্দ বেদনা এবং এক অনন্য মানসিক শূন্যতা।

 

কবি নজরুলের মা, কবি পত্নি প্রমিলার মৃত্যু তারিখ

 

কবি নজরুলের মা, কবি পত্নি প্রমিলার মৃত্যু তারিখ

কাজী নজরুলের মা জাহেদা খাতুন ছিলেন এক দরিদ্র কিন্তু গভীর মানবিকতার অধিকারিণী নারী। তাঁর সংসার ছিল কোলাহল, দারিদ্র্য, সন্তানলালন এবং সংগ্রামের কঠিন বাস্তবতায় ভরা। নজরুল ছোটবেলা থেকেই মায়ের স্নেহ, ত্যাগ, পরিশ্রম ও মানসিক শক্তির ওপর নির্ভর করেই বড় হয়েছিলেন। মক্তবে শিক্ষকতা, মুয়াজ্জিনের কাজ কিংবা রুটির দোকানে শ্রম—সব কিছুর পেছনে ছিল মায়ের প্রতি তাঁর গভীর দায়িত্ববোধ। কিন্তু এই অসাধারণ নারী ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের ১৫ জ্যৈষ্ঠ (১৯২৮ সালে) পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। যখন মা মারা যান, তখন নজরুল সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে উঠতে শুরু করেছেন; তবুও মায়ের মৃত্যু তাঁর জীবনে তৈরি করে এক অপূরণীয় শূন্যতা, যা কোনো রচনায় তিনি সরাসরি লিখে যাননি, কিন্তু তাঁর কাব্যে ছড়িয়ে আছে মমতা, ব্যথা এবং মানুষের প্রতি অগাধ করুণার যে ভাষা—তা থেকেই বোঝা যায় তিনি তাঁর মাকে কী গভীরতায় ধারণ করতেন।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

 

অন্যদিকে নজরুলের দাম্পত্যজীবন ছিল প্রেম, সংগ্রাম ও ত্যাগের এক অসামান্য উপাখ্যান। তাঁর স্ত্রী প্রমীলা নজরুল ইসলাম, জন্মসূত্রে আশালতা সেনগুপ্তা, ছিলেন তাঁর সহযোগী, সহগামী এবং জীবনের সকল ঝড়–ঝাপটার মধ্যে অটল সঙ্গী। প্রেমের টানে বর্ণ–ধর্মের বিভাজন অতিক্রম করে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নজরুলই স্নেহের নাম দেন ‘প্রমীলা’। স্বামী–স্ত্রীর এই সম্পর্ক ছিল গভীর শ্রদ্ধা, উদারতা ও মানবিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত—যা নজরুলের অনেক গানের বাণীতে প্রতিফলিত হয়।

কিন্তু এই সুখী দাম্পত্যে নেমে আসে এক ভয়াবহ দুর্যোগ। মাত্র ৩০ বছর বয়সে, ১৯৩৮ সালে, প্রমীলা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। তাঁর নিম্নাঙ্গ সম্পূর্ণ অবশ হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সংকট এবং ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য—সবকিছুর মধ্যেও নজরুল তাঁর স্ত্রীকে সুস্থ করতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালান। তিনি কোনো চিকিৎসার পথ বাদ রাখেননি—হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, কবিরাজি চিকিৎসা—যা কিছু আশার আলো দেখাত, তিনি তা অনুসরণ করেছেন আন্তরিকভাবে।

এমনকি নজরুল ছিলেন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী যে মানুষকে বাঁচাতে কখনো কখনো অলৌকিক শক্তির দ্বারস্থ হওয়া যায়। তাই তিনি প্রমীলাকে সুস্থ করতে সাধু, সন্ন্যাসী, পীর, দরবেশ, মাজারের পানিপড়া, তাবিজ—সবকিছুর আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর এই মানবিক ব্যাকুলতার একটি মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন কবি জসীম উদ্‌দীন। একটি দরবেশের পরামর্শে নজরুল একবার শত বছরের কচুরীপানায় ভরা দুর্গন্ধময় ডোবার মধ্যে রাতভর নিমজ্জিত ছিলেন, শুধু এই বিশ্বাসে যে সেই তাবিজটি প্রমীলাকে আরোগ্য দেবে। কিন্তু অবশেষে সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়—প্রমীলা স্থায়ীভাবেই পঙ্গু হয়ে পড়েন।

দুরারোগ্য অবস্থায় থেকেও প্রমীলা নজরুলের প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা, কোমলতা ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন। কবি যখন ১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে বাকশক্তিহীন ও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তখন প্রমীলাই তাঁর শুশ্রূষায় নিয়োজিত ছিলেন। নিজের পক্ষাঘাতগ্রস্ত শরীর নিয়েই তিনি স্বামীকে আগলে রেখেছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৬২ সালের ৩০ জুন, প্রমীলা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁকে দাফন করা হয় নজরুলের জন্মস্থান চুরুলিয়ার মাটিতে। সেখানে আজও তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন, যার পাশেই ঘুমিয়ে আছেন জাতীয় কবি নজরুল।

মা জাহেদা খাতুনের মৃত্যু যেমন নজরুলের জীবনের শেকড় ভেঙে দিয়েছিল, তেমনি প্রমীলার মৃত্যু তাঁর আবেগজগতে রেখে গেছে গভীর ক্ষত। এই দু’জন নারী ছিলেন তাঁর জীবনের আলো—একজন মাতৃত্বের আদর দিয়ে, আরেকজন প্রেমের নিবেদনে। তাঁদের মৃত্যু নজরুলের জীবনের এক গভীর ট্র্যাজেডি, যা তাঁর সৃজনশীল সত্তাকে মমতায় ও মানবিকতার আলোয় আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।

Leave a Comment