নজরুলের একটি গানের শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের অবস্থান — এই বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আমাদের নজর দিতে হবে তাঁর গীতিকবিতার সামগ্রিক নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দিকে। কাজী নজরুল ইসলামের গান শুধু সংগীত নয়, তা কবিতা, দর্শন ও অলঙ্কারবোধের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। তাঁর গানে ছন্দ, শব্দ, অনুপ্রাস, উপমা, রূপক, যমক প্রভৃতি অলঙ্কার এমনভাবে মিশে গেছে যে প্রতিটি গীতিকবিতা একটি নন্দনভূমি নির্মাণ করে, যেখানে ভাব ও রসের সুরেলা ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

নজরুলের একটি গানের শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের অবস্থান
নজরুলের অলঙ্কারবোধ
নজরুল মূলত শব্দের জাদুকর। তিনি জানতেন কীভাবে শব্দের সৌন্দর্য, ধ্বনি ও প্রতিধ্বনির মাধ্যমে মানসিক আবেগ জাগানো যায়। তাঁর গানে শব্দালঙ্কার অর্থাৎ অনুপ্রাস, যমক, শ্লেষ, পুনরুক্তি প্রভৃতি এমনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যে গানটি শ্রুতিমধুর এবং সুরসিক্ত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, অর্থালঙ্কার যেমন রূপক, উপমা, অতিশয়োক্তি, সমাসোক্তি বা ব্যঞ্জনা তাঁর ভাবকে গভীরতা দেয়, গানে আনে ব্যাখ্যাযোগ্য ভাবধারা ও দার্শনিকতা।
দৃষ্টান্ত বিশ্লেষণ
উদাহরণস্বরূপ আমরা যদি নজরুলের বিখ্যাত পংক্তিটি দেখি—
“চাঁদ হেরিতেছে চাঁদ-মুখ তার সরসীর আরশিতে।”
(অখণ্ড নজরুল-গীতি)
এই পংক্তিতে চাঁদ শব্দটি দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে— প্রথম ‘চাঁদ’ আকাশের চাঁদ, দ্বিতীয় ‘চাঁদ-মুখ’ রূপসী নারীর মুখমণ্ডল। একই শব্দ ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হওয়ায় এটি যমক অলঙ্কারের একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। যমক অলঙ্কারের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, একই শব্দের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও তার প্রতিবারের অর্থ ভিন্ন হয়, ফলে ভাষায় সুরেলা বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে, চাঁদের আরশিতে মুখ দেখা — এই কল্পনা বাস্তব নয়, এটি মানবীয় গুণের আরোপ চাঁদের উপর। চাঁদ কখনও নিজের মুখ ‘আরশিতে’ দেখতে পারে না, মানুষের পক্ষেই তা সম্ভব। ফলে এখানে সমাসোক্তি অলঙ্কারও বিদ্যমান, যেখানে উপমেয় (চাঁদ) এবং উপমান (মানুষ)-এর বৈশিষ্ট্য একীভূত হয়েছে। তদুপরি, সরসী (জলাশয়)-এর সাথে আরশির তুলনা করায় রূপক অলঙ্কারের উপস্থিতিও সুস্পষ্ট। এইভাবে নজরুল একই পংক্তিতে বহুমাত্রিক অলঙ্কারের স্তর সৃষ্টি করেছেন — এটি তাঁর কাব্যদৃষ্টির গভীরতা ও রূপকল্পনার প্রখরতার পরিচায়ক।
নজরুলের অলঙ্কার ব্যবহার ও গানের তাৎপর্য
নজরুলের অলঙ্কার ব্যবহারের লক্ষ্য কখনও কেবল ভাষার শোভা বৃদ্ধি নয়, বরং ভাব ও আবেগের গভীরতাকে স্পষ্ট করা। তাঁর গান যেমন আবেগময়, তেমনি তাতে সামাজিক, মানবিক ও দার্শনিক দৃষ্টিও নিহিত। উদাহরণস্বরূপ—
“আমার কণ্ঠে আজ রক্ত গরজে, আমার বীণায় ঝড়।”
এখানে “রক্ত গরজে” বা “বীণায় ঝড়” – উভয়ই অতিশয়োক্তি ও রূপক অলঙ্কারের অসাধারণ উদাহরণ, যা কবির অন্তর্দাহ, প্রতিবাদ ও বিপ্লবী সত্তার শক্তিকে প্রকাশ করে।
নজরুলের গানে শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার পরস্পরকে পরিপূরক করে। শব্দের ধ্বনি, ছন্দ, সুর ও ভাবের গভীর মিলনে তাঁর গান হয়ে ওঠে এক বহুমাত্রিক কাব্যসৃষ্টি। তিনি শুধু বাংলা গানের ছন্দ ও সুরকে নয়, তার ভাবপ্রকাশক রচনাশৈলীকেও সমৃদ্ধ করেছেন। ফলে তাঁর গানে অলঙ্কার কোনো কৃত্রিম সাজ নয়, বরং আবেগ, ভাবনা ও সুরের এক স্বাভাবিক ও জীবন্ত প্রকাশ।

